ভারতের শিল্পজগতের প্রভাবশালী টাটা গোষ্ঠীতে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে বিরোধ দেখা দিয়েছে। একদিকে রয়েছেন টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা। অন্যদিকে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরন।গত ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত টাটা সন্সের বোর্ড সভার পর এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্যে এসেছে। বোর্ড চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর পক্ষে ভোট দিয়েছে। একমাত্র নোয়েল টাটা এর বিরোধিতা করেছেন।
একই সভায় ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার নির্দেশের বিরোধিতা না করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রেও নোয়েল টাটা আপত্তি জানিয়েছিলেন।
টাটা গোষ্ঠীর কাঠামো ভারতের অন্য বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর তুলনায় আলাদা। টাটা ট্রাস্টস হলো গোষ্ঠীটির সবচেয়ে বড় শেয়ারধারী।নোয়েল টাটা এই ট্রাস্টগুলোর চেয়ারম্যান।
অন্যদিকে টাটা সন্স হলো টাটা গোষ্ঠীর মূল হোল্ডিং কোম্পানি। এই প্রতিষ্ঠানই গোষ্ঠীর বিভিন্ন ব্যবসা পরিচালনা করে। ফলে টাটা ট্রাস্টসের মালিকানা ও প্রভাব এবং টাটা সন্সের পরিচালন ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১৭ সেপ্টেম্বরের সভায় টাটা সন্সের বোর্ড চন্দ্রশেখরনের তৃতীয় মেয়াদের পক্ষে ভোট দেয়। বোর্ডের ভোট পড়ে ৪-১। নোয়েল টাটাই ছিলেন একমাত্র বিরোধী।
অথচ এর এক মাস আগে চন্দ্রশেখরন জানিয়েছিলেন, তিনি আর নতুন মেয়াদ চাইবেন না।
নোয়েল টাটা বোর্ডের ভোটকে ‘আইনগতভাবে অকার্যকর’ বলে দাবি করেছেন। টাটা ট্রাস্টস ও টাটা সন্স—দুই পক্ষই এ বিরোধ সামলাতে আইনজীবী নিয়োগ করেছে।
দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সাইরাস মিস্ত্রির অপসারণ পরবর্তী আইনি লড়াইয়ে যুক্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে টাটা সন্সের গঠনতন্ত্রে থাকা বোর্ডের ভোটের নিয়ম।
টাটা ট্রাস্টসের দাবি, ট্রাস্টের মনোনীত পরিচালকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ট্রাস্টের পক্ষের বক্তব্য, দুইজন মনোনীত পরিচালকের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানে দুজনের সমর্থন।
অন্যদিকে টাটা সন্সের যুক্তি, ট্রাস্টের অন্য প্রতিনিধিসহ সভাপতির ভোট বিবেচনায় নিলে বোর্ডে সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে।
এই ব্যাখ্যার কোনটি সঠিক, তা শেষ পর্যন্ত আদালতকে নির্ধারণ করতে হতে পারে।
এই বিরোধে আরেক পক্ষেরও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। তিনি শাপুর মিস্ত্রি। শাপুর প্রয়াত সাইরাস মিস্ত্রির ভাই এবং নোয়েল টাটার শ্যালক।
মিস্ত্রি পরিবারের প্রতিষ্ঠান এসপি গ্রুপ টাটা সন্সের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু শেয়ারধারী। তাদের হাতে টাটা সন্সের প্রায় ১৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
এসপি গ্রুপের বড় ঋণ রয়েছে। তাই টাটা সন্সের এই অংশীদারত্ব বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের আগ্রহ রয়েছে মিস্ত্রি পরিবারের।
টাটা ও মিস্ত্রি- দুই পারসি ব্যবসায়ী পরিবারের মধ্যে প্রায় এক শতাব্দীর সম্পর্ক রয়েছে।
টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ কাঠামোয় আরবিআইয়ের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২১ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের বড় নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার নিয়ম করে। এর পর টাটা সন্সকে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টিও সামনে আসে।
টাটা সন্স দীর্ঘদিন ধরে এর বিরোধিতা করে আসছিল। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের ঋণ পরিশোধ করেছে। এ ছাড়া টাটা ক্যাপিটালকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করেছে।
কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর আরবিআই টাটা সন্সের সর্বশেষ আইনি আপত্তিও নাকচ করে দেয়। ফলে টাটা সন্সের সামনে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পথ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
২২ সেপ্টেম্বর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আরবিআই দ্রুত টাটা সন্সের তালিকাভুক্তির বিষয়টি এগিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে।
এর উদ্দেশ্য হতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা না রাখা।
টাটা সন্স শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে টাটা ট্রাস্টসের প্রভাব কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ট্রাস্টের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
তবে এতে চন্দ্রশেখরনের তৃতীয় মেয়াদ নিশ্চিত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ তার মেয়াদ নিয়ে আইনি বিরোধ বর্তমান গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতেই চলবে।
টাটা গোষ্ঠীর এই বিরোধ শুধু একটি ব্যবসায়ী পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। ভারতের শিল্পনীতিতেও টাটা গোষ্ঠীর বড় ভূমিকা রয়েছে।
টাটা ইলেকট্রনিকসের একটি কারখানা থেকে আগামী বছরের শুরুতে ভারতে তৈরি চিপ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। ভারতে তৈরি অ্যাপলের আইফোনের প্রায় ৪৬ শতাংশও উৎপাদন করে টাটা।
এ ছাড়া বেসরকারীকরণের পর এয়ার ইন্ডিয়াকে ঘুরে দাঁড় করানোর দায়িত্বও টাটার হাতে। দেশটির অভ্যন্তরীণ আকাশপথের প্রায় এক-চতুর্থাংশেএয়ার ইন্ডিয়ার উপস্থিতি রয়েছে।
টাটা গোষ্ঠীর বর্তমান দ্বন্দ্বে এন চন্দ্রশেখরনের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ মনে করেন, ভারত সরকার তাকে টাটা সন্সের নেতৃত্বে দেখতে আগ্রহী।
আবার অন্যদের মতে, বোর্ডের এই বিরোধ ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি মুম্বাইয়ে এক অনুষ্ঠানে জেপি মরগ্যান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমন চন্দ্রশেখরনের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের দ্বন্দ্ব বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারেএ নিয়ে সরকারের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।
টাটা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ এখন তাই বোর্ডরুমের সীমানা ছাড়িয়ে আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ভারতের শিল্পনীতির আলোচনাতেও চলে এসেছে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট