বাংলাদেশ রেলওয়ের অবৈধ দখলে রয়েছে ৩ হাজার একরের বেশি জমি, যা উদ্ধারে বিশেষ অভিযান এবং সফটওয়্যারভিত্তিক ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ২৫ হাজার একরের বেশি জমি ইজারা দিয়ে গত অর্থবছরে ৮৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা আয় করেছে রেলওয়ে। রেলের উন্নয়নে মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে ৬০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহ এবং টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে অনলাইন ব্যবস্থায় নজরদারি জোরদারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
বৈঠকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি, পরিচালন ব্যয় ও আয় অনুপাত এবং রেলওয়ের জমি ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করা হয়। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট জমি ৬৩ হাজার ৭২ দশমিক ৯০৯ একর।
 এর মধ্যে ৪২ হাজার ৯ দশমিক ৫২ একর নিজস্ব কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইজারা দেওয়া হয়েছে ২৫ হাজার ৮৩ দশমিক ১৩৮৮ একর। জমিসংক্রান্ত ১ হাজার ৯৯১টি মামলা চলমান রয়েছে।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলি আসগার বলেন, ‘বৈঠকে তেমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এমনিতে গত সভার কয়েকটি এজেন্ডা ছিল, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
রেলওয়ের বেদখল জমি উদ্ধারে উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। অব্যবহৃত জমি ইজারা বা লাইসেন্সের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জমি ব্যবস্থাপনায় সম্প্রতি রেলওয়ে স্টেট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগে বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। 
এসব কমিটি আগামী তিন মাসের মধ্যে বেদখল জমি চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে অবৈধ স্থাপনা অপসারণের ব্যবস্থা নেবে। রেলভূমিতে মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বন্দর-ঢাকা রুটে নিয়মিত কনটেইনার পরিবহন হচ্ছে। বিভিন্ন গন্তব্যে জ্বালানি ও খাদ্যশস্যও নেওয়া হচ্ছে। তবে মিটারগেজ লোকোমোটিভের সংকটে মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা কমেছে। নতুন ৩০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। 
আগে অনুমোদিত আরও ৩০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ২০২৯ সালে ৬০টি লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা গেলে মালবাহী ট্রেন বাড়ানো সম্ভব হবে। বিশ্বব্যাংকের গ্রিন রেলওয়ে প্রকল্পের আওতায় আরও ২০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।
বর্তমানে মোংলা বন্দর থেকে টাঙ্গাইলের সয়দাবাদ ও জয়পুরহাটে সীমিত পরিসরে মোলাসেস পরিবহন করা হচ্ছে। মোংলা থেকে অন্য পণ্য পরিবহনের চাহিদা নেই বলে জানিয়েছে রেলওয়ে। বর্তমানে ৯৫/৯৬ নম্বর ট্রেনটি মোংলা-বেনাপোল রুটে চলছে। 
বহরে পর্যায়ক্রমে ২০০টি ব্রডগেজ কোচ যুক্ত হবে; এর মধ্যে ১৮টি এসেছে। কোচ পাওয়া সাপেক্ষে মোংলা-ঢাকা রুটে ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ভাঙ্গা-বরিশাল রেললাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বেনাপোল-খুলনা রুটে সকালে কমিউটার ট্রেন চালুর ব্যবস্থার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।
অনলাইনে টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে একই ডিভাইস বা ব্রাউজার থেকে ভিন্ন পরিচয়পত্র ও ফোন নম্বরে একাধিক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, একই পেমেন্ট মাধ্যমের পুনর্ব্যবহার, অস্বাভাবিক পেমেন্ট এবং বটের মাধ্যমে টিকিট বুকিংয়ের চেষ্টা শনাক্ত করে অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হচ্ছে। 
মাসিক রিফান্ডের হার ৫০ শতাংশ ছাড়ালে এক মাসের জন্য অ্যাকাউন্ট বন্ধ রাখা হয়। বারবার বুকিং বাতিল এবং অল্প সময়ে অতিরিক্ত পাসওয়ার্ড রিসেট বা অ্যাকাউন্টের তথ্য পরিবর্তনের চেষ্টাও নজরদারিতে রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে টিকিটের নাম ও পরিচয়পত্র যাচাই করা হচ্ছে। তথ্যে অমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীকে বিনা টিকিটের যাত্রী হিসেবে বিবেচনা করে ভাড়া ও জরিমানা আদায় করা হচ্ছে। টিকিট কেনার সংখ্যা সীমিত করা, বিশেষ টাস্কফোর্স, মোবাইল কোর্ট, ব্লক চেকিং এবং চলন্ত ট্রেনে বিশেষ পরীক্ষা চালু রয়েছে। 
নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে অভিযানও চলছে। যাত্রার ১০ দিন আগে সব আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট একসঙ্গে ছাড়ার পরিবর্তে প্রতিদিন ১০ শতাংশ করে ছাড়ার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বগুড়ার সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন জমি ও অবকাঠামো রক্ষা এবং রেলগেটের যানজট নিরসনে অবৈধ স্থাপনা অপসারণের সুপারিশ করেছে কমিটি। পাকশীর বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তার নেতৃত্বে এসব স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। 
আগামী দুই মাসের মধ্যে সেগুলো সরানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের সমন্বয়ে রেলগেটের যানজট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, আব্দুল মহিত তালুকদার, ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো এবং মুহাম্মদ আজীজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।