মবিলের (লুব্রিকেন্ট) ব্যবসার সম্ভাবনাময় জেলা দিনাজপুরে কী পরিমাণ মবিল বেচাকেনা হয়, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তদারকি না থাকার ফলে দিনাজপুরের যানবাহন মালিক-চালকদের অনেকেই জানেন না, তারা আসল নাকি নকল মবিল ব্যবহার করছেন।
দিনাজপুর জেলায় মোটরসাইকেলের জন্য সর্বনিম্ন ২৮০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ১৮০ টাকা এবং বড় যানবাহনের জন্য সর্বনিম্ন ২ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৭ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত মবিল বিক্রি হয়ে থাকে। কোম্পানি ও দোকানি ছাড়া মোড়কের মারপ্যাঁচে কোনটি আসল আর কোনটি নকল, তা বোঝার উপায় নেই। অভিযোগ রয়েছে, পোড়া বা ব্যবহৃত মবিল সংগ্রহ করে একটি চক্র কেমিক্যাল ও রং মিশিয়ে রিফাইন করে ভেজাল মবিল বাজারে ছাড়ছে।
বাজার ঘুরে জানা যায়, মোটরসাইকেলের জন্য ব্যবহৃত মবিলের মধ্যে মোবিল সুপার ফোর-টি ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা, সেল কোম্পানির অ্যাডভান্স এএক্স-৫/এএক্স-৭ ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ টাকা, ক্যাস্ট্রল কোম্পানির অ্যাক্টিভ ৪টি ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৫৫০ টাকা, মতুল কোম্পানির ৩০০০ ৪টি ৬৬০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, লিকুই মলি কোম্পানির হ্যাবিলন ইজেডএক্স/সুপার ৪টি ৫৮০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং সিস্ট্র ২টি/৪টি ৮৫০ থেকে ২ হাজার টাকা লিটার বিক্রি হচ্ছে।
অপরদিকে বড় বিভিন্ন ধরনের গাড়ির জন্য ৪ থেকে ৪.৭৩ লিটার মবিলের মধ্যে কোম্পানির মবিল ২ হাজার ৭০০ থেকে ৭ হাজার ৮০০ টাকা, সেল কোম্পানির মবিল ২ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা, ক্যাস্ট্রল ২ হাজার ৮০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা, টোটাল এনগ্রিজ কোটাজ ৫০০০ মবিল ২ হাজার ৬০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা এবং বিএনও মাস্টার বাংলাদেশি মবিল ২ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
ট্রাক ও বাসের জন্য মবিল ডেলভেক এমএক্স ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা এবং ক্যাস্ট্রল সিআরবি টার্বোম্যাক্স ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বাইকের জন্য মতুল, সাউদি, ইসিস্টার, ট্রু প্রিমিয়াম ৪, জেনুইন, ডিটিএসআই ও কেটিএম ৪৫০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
বিআরটিএ অফিস সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর জেলায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ৫৮৪টি নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোটরসাইকেল রয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৮০টি। আর অনিবন্ধিত মোটরসাইকেল, নছিমন, করিমন, পাগলু, ইজিবাইক, ভটভটিসহ অন্যান্য যানবাহন প্রায় ৩ লাখ। সব মিলিয়ে সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ যানবাহনের জন্য দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলায় রয়েছে বিশাল মবিলের বাজার।
শহরের মন্সিপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল করিম (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আসল এবং রিসাইকেল করা মবিলসহ সব ধরনের মবিল বিক্রি হয়ে থাকে। আমদানি করা মবিলের দাম অনেক বেশি। ক্রেতা বেশি দামে মবিল কিনতে চান না। তাই অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে রিসাইকেল করা মবিল বিক্রি করে থাকেন। সেটা আবার উপজেলা পর্যায়ে অনেক বেশি। আসল-নকল কোনো ক্রেতার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। বাজারে যে মবিলগুলো ব্যবহার হয়, তা দিয়ে কোনোভাবেই ১ হাজার কিলোমিটারের বেশি মোটরসাইকেল চালানো যায় না। তাই দিনাজপুরে অন্যান্য জেলার চেয়ে মবিলের চাহিদা বেশি।’
আরেক ব্যবসায়ী রতন রায় (ছদ্মনাম) বলেন, ‘ছয় মাস আগে প্রত্যেক ব্র্যান্ডের মবিলের দাম লিটারে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগামীতে মবিলের দামও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেটা ছয় মাসের আগে নয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘মবিল শুধু মার্কেটে বা দোকানেই বিক্রি হয় এমনটি নয়। অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা মার্কেটে দোকান না নিয়েই বাড়িতে মবিল রেখে মেকারদের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করে ব্যবসা চালাচ্ছেন। এই মবিলগুলোই সবচেয়ে বেশি ভেজাল। এতে করে মানুষের যানবাহনের ক্ষতি হচ্ছে ও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।’
এদিকে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও মেকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেকারের দোকানগুলোতে মবিল পরিবর্তন করার পর মেকাররা মবিলগুলো ড্রামে সংরক্ষণ করেন। সেই ব্যবহৃত বা পোড়া মবিলগুলো শহরের শেকপুরা এলাকার এক ব্যবসায়ী, বীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বাড়ী এলাকার চারজন ব্যবসায়ী এবং নীলফামারী ও যশোর জেলার কয়েকজন ব্যবসায়ী পিকআপ পাঠিয়ে পুরাতন ড্রামে ভরে কিনে নিয়ে যান। পরে কেমিক্যাল ও রং দিয়ে পুনরায় রিফাইন করে বাজারে ড্রামে ভরেই বিক্রি করছেন। যা অত্যন্ত নিম্নমানের।
তারা বলেন, ‘পুরাতন মবিল কেনাবেচার চিত্র শুধু দিনাজপুরেই নয়। এই ব্যবসা সারাদেশেই চলছে। এদের প্রতিহত করতে না পারলে দেশের যানবাহন যেমন দ্রুত বিকল হয়ে পড়ছে, তেমনি পরিবেশও মারাত্মকভাবে হুমকির মধ্যে পড়ছে।’
মবিল ডিলারের দোকানের সাবেক কর্মচারী মিলন বলেন, ‘মবিলের পট, জার, গ্যালন বা বোতল দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই কোনটা আসল ও কোনটা নকল। কেউ ডুপ্লিকেট তৈরি করছেন, কেউ আবার পুরাতন পট, জার, গ্যালন, বোতল, প্যাকেট সংগ্রহ করে তা পরিষ্কার করে সেগুলোতেই ভেজাল মবিল ভরে বাজারে ছাড়ছেন। কেউ আবার হুবহু প্যাকেট করছেন। এটা প্রস্তুতকারী, ব্যবসায়ী ও মেকাররা ছাড়া কেউ চিনতে পারবেন না। এমনও ঘটনা আছে, প্যাকেট খোলার পর ভেতরে শুধু পানি পাওয়া গেছে। বাজারে যে মবিলগুলো বিক্রি হচ্ছে, তার সিংহভাগই ভেজাল মবিল।’
দিনাজপুর জেলা ক্যাবের প্রচার সম্পাদক মাসউদ রানা বলেন, ‘দেশে মবিলের ব্যাপক বাজার রয়েছে। অথচ আমরা পুরোপুরি আমদানি নির্ভরশীল। আর এ সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভেজাল ও নিম্নমানের মবিল তৈরি ও বিক্রি করছে। ভেজাল মবিল ও মবিল রিসাইকেলকারী এই অসাধু চক্রটিকে দেশের স্বার্থে চিহ্নিত করা জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘মবিল ব্যবসাটি পুরোপুরিভাবে তদারকির আওতায় এনে দেশে মবিল উৎপাদনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা উচিত। এতে করে দেশে কর্মসংস্থান যেমন তৈরি হবে, তেমনি মবিল আমদানি বন্ধ হয়ে দেশেই মবিল উৎপাদন হবে। আমদানি বন্ধ হলে বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয় হবে।’
সারাদেশ · ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · অপরাহ্ণ ২:২৯ · প্রতিবেদক: Rahima Khanam
নতুন মোড়কে রমরমা কারবার
