সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সূচনা বাঁশি বাজতে বাকি ৪০ ঘণ্টা (এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত), তখন অংশীজনের মধ্যে এমন সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট।

আসরের ভেন্যু ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে এই আসরের কোনো চিহ্ন চোখে পড়েনি গতকাল দুপুর পর্যন্ত। গল্প-আড্ডায় নেই বাংলাদেশ দল। ২০০৩ সালের পর প্রায় দুই যুগের বন্ধ্যত্ব কাটিয়ে দ্বিতীয় শিরোপার নাগাল পাওয়া সংক্রান্ত কৌতূহলও বিস্ময়করভাবে উধাও ফুটবলামোদীদের মাঝে।

কোন দল কখন আসবে, থাকবে কোন হোটেলে, অনুশীলন কোথায়, সূচিই বা কী—এসব তথ্যও সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। সবকিছুতেই কেমন যেন গা-ছাড়া ভাব। ঢাকায় পৌঁছানো অতিথি দল নিয়েও নিশ্চিত তথ্য দিতে পারছে না স্থানীয় আয়োজক বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। বাফুফের এক কর্মকর্তা স্থানীয় এক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘দলগুলোর ঢাকায় পৌঁছানোর ছবি তুলতে সাফের কাছে একজন আলোকচিত্রী চেয়েছিল বাফুফে, কিন্তু উত্তরের বদলে মিলেছে শুধু অপেক্ষা। নিজেদের আলোকচিত্রী পাঠানো যেত। সাফ পারিশ্রমিক দেবে না; তাহলে বাফুফের আলোকচিত্রী কেন তাদের জন্য খাটবে?’ এই এক বক্তব্যেই দুই সংস্থার দূরত্ব আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যায়।

আসর শুরুর আগে রাজধানীর পথে বা স্টেডিয়াম এলাকায় বিলবোর্ড, ফেস্টুন কিংবা দৃশ্যমান প্রচার নেই। টিকিট, ম্যাচসূচি বা উদ্বোধনী আয়োজন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ নেই। আসরের শিরোনাম-স্পনসর থাকলেও তার ছাপ শহরজুড়ে চোখে পড়ে না। অথচ এই আসরের পরিচিতি সামান্য নয়। দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ আসর বলে যাকে ডাকা হয়।

৫ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টায় উদ্বোধন ম্যাচে মুখোমুখি ভারত ও পাকিস্তান। রাত ৮টায় ভুটানের বিপক্ষে নামবে স্বাগতিক বাংলাদেশ। দেশের ফুটবলপ্রেমীদের সেই পুরোনো উন্মাদনা অনুপস্থিত। এক সময় সাফ মানেই ছিল টিভির সামনে আর চায়ের দোকানে উপচে পড়া ভিড়, পাড়ায়-মহল্লায় তুমুল তর্ক। সেই ঐতিহ্য আজ ম্লান। কারণ খুঁজতে গেলে একাধিক সুতো এক জায়গায় মেলে। জাতীয় দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের ঘাটতি, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অস্থিরতা আর মাঠের ফুটবলের মান নিয়ে হতাশা মিলে দর্শককে ধীরে ধীরে স্টেডিয়াম থেকে দূরে সরিয়েছে। মনোযোগের একটা বড় অংশও এখন অন্য খেলা আর দৈনন্দিন টানাপড়েনে ভাগ হয়ে গেছে। আর আয়োজকদের পেশাদারির ঘাটতি, অর্থাৎ ‘রুটিন ওয়ার্ক’ সেরে ফেলার মানসিকতা, গণমাধ্যমে বারবার উঠে এসেছে।

২০১৮ সালে ঢাকায় সর্বশেষ আসরের আগে স্বাগতিক দলকে উজ্জীবিত করতে সাবেকদের একত্র করার উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। এবার তা হয়েছে ২০০৩-এর সাফজয়ী দল আর ২০১০ সালের এসএ গেমসে স্বর্ণজয়ী দলের একটি প্রীতি ম্যাচে। সাফজয়ী দলের একঝাঁক নায়ককে দেখা গেল ঠিকই, সেটা অনূর্ধ্ব-১৫ ফিফা বিশ্বকাপ ও ফেস্টিভ্যালে খেলে আসা দলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে—বিয়েবাড়ির আদলে সাজানো অতিথির আসনে। রজনীকান্ত বর্মণ, আলফাজ আহমেদ, আরমান মিয়ার সঙ্গে সেখানে অতিথি ছিলেন ওই দলের গোলরক্ষক মো. আমিনুল হক।

এতদিন সাফ ঘিরে যা একটু উত্তাপ ছিল, তা জাতীয় স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের অনুশীলনকে ঘিরে। ভেন্যুর নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে সাফের হাতে, তাই ইচ্ছামতো ব্যবহারের সুযোগ নেই। গতকাল প্রস্তুতি সরাতে হয়েছে এবিজি স্পোর্টস সিটির মাঠে। তাই বিশ্বাস করাই কঠিন, রাত পোহালেই বল গড়াচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পুরোনো মহারণের। মাঠের লড়াই জমতেই পারে, বিদেশে খেলা তারকাদের হোম ফ্যানদের সামনে দেখার সুযোগও আলাদা আকর্ষণ। কিন্তু উন্মাদনা শুধু মাঠে জন্মায় না, জন্মায় আয়োজনের যত্নে আর আস্থায়। সেই আস্থা ফেরানোর দায়ই এখন

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।